করোনা মোকাবেলা: মাস্ক না পরলে জরিমানার পাশাপাশি জেল
2020.11.30
ঢাকা

শীত পড়ার সাথে সাথে দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আড়াই হাজারের বেশি মানুষের শরীরে করোনা শণাক্ত হয়েছে, যা গত প্রায় তিন মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।
এই পরিস্থিতিতে মাস্ক ছাড়া ঘরের বাইরে বের হলে ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানার পাশাপাশি জেল দিতে পারে বলে সোমবার নাগরিকদের সতর্ক করেছে সরকার।
মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে এমনটাই সাংবাদিকদের জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। অনলাইনে যুক্ত থেকে সোমবার এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
“জেলা প্রশাসকেরা বলছেন, জেলা সদরে মানুষ মোটামুটি কেয়ারফুল হচ্ছে,” জানিয়ে সচিব বলেন, ঢাকা শহরের মানুষ এখনও পুরোপুরি সতর্ক হয়নি। তবে মাস্ক না পরলে ৫০০ টাকা জরিমানা দিতে হবে এই বার্তা ‘মোটামুটি’ সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে।
“এখন থেকে ম্যাক্সিমাম ফাইন করতে বলা হয়েছে,” উল্লেখ করে সচিব বলেন, “তারপরও মাস্ক না পরলে জেলের শাস্তির দিকে যেতে হবে।”
মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করতে চলমান ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের শক্ত অবস্থানে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন চিকিৎসা বিশ্লেষকেরা।
“মাস্ক পরা এবং সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার মতো বিষয়গুলোই আমাদের নিরাপদ রাখবে,” বেনারকে জানান চিকিৎসা নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক আতিক আহসান।
“সরকারের এই উদ্যোগকে অ্যাপ্রিসিয়েট করি। অবশ্যই সবার মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে হবে। যদিও এই ব্যবস্থা আরও আগে নেওয়া উচিত ছিল,” বেনারকে বলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান খসরু।
শীতে করোনার প্রকোপ বাড়তে পারে এমন আশঙ্কায় গত জুলাইর শেষ দিকে ঘরের বাইরে সকল স্থানে সবার মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করে সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও জনসাধারণকে এ বিষয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানান।
এরপর ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানার ব্যবস্থা করা হয়। তবে এখন পর্যন্ত বহু মানুষ ঘরের বাইরে মাস্ক ব্যবহার করছেন না।
তিন মাসে সর্বোচ্চ সংক্রমণ
গত বছর ডিসেম্বরে প্রথম চীনে করোনাভাইরাস ধরা পড়লেও বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রথম রোগী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। এর দশ দিন পর ১৮ মার্চ দেশে প্রথমবারের মতো এই রোগে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন-জুলাই মাসে বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হন, ৪০ জনের বেশি মারা যান। তবে সেপ্টেম্বরের দিকে আক্রান্ত ও মৃতের হার কমে আসে। শীতের শুরুতে আক্রান্ত ও মৃতের হার আবার বাড়তে শুরু করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন দুই হাজার ৫২৫ জন। এর আগে সর্বশেষ গত ২ সেপ্টেম্বর দেশে একদিনে করোনা শনাক্ত হয় দুই হাজার ৫৮২ জনের শরীরে।
এ পর্যন্ত করোনাভাইরাস আক্রান্ত মোট রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে চার লাখ ৬৪ হাজার ৯৩২ জন।
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে করোনাভাইরাসে মারা গেছেন ৩৫ জন। এখন পর্যন্ত এই রোগে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ছয় হাজার ৬৪৪ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাস থেকে সেরে উঠেছেন মোট তিন লাখ ৮০ হাজার ৭১১ জন।
সোমবার পর্যন্ত কক্সবাজারে মোট ৩৫৭ জন রোহিঙ্গা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে বেনারকে জানান শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) কার্যালয়ের প্রধান স্বাস্থ্য সমন্বয়কারী ডা. আবু তোহা এম আর এইচ ভূঁইয়া।
এই রোগে এখন পর্যন্ত নয় জন শরণার্থী মারা গেছেন বলেও জানান তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে, এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ছয় কোটি ২৯ লাখ ৫৩ হাজারের বেশি মানুষ, মারা গেছেন ১৪ লাখ ৬৩ হাজারের বেশি।
জনস হপকিন্স এর তালিকা অনুযায়ী, বিশ্বে শনাক্তের দিক থেকে বাংলাদেশ ২৬তম স্থানে আর মৃতের সংখ্যায় রয়েছে ৩৩তম অবস্থানে।
বিনামূল্যে দেয়া হবে তিন কোটি টিকা
বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের টিকা আসা শুরু হলে বিনামূল্যে তিন কোটি ডোজ টিকা বিতরণ করা হবে বলে সোমবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম।
প্রসঙ্গত এখন পর্যন্ত প্রায় দশ কোটি ডোজ টিকা প্রাপ্তি নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশে।
যার মধ্যে রয়েছে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট উৎপাদিত ‘অক্সফোর্ড আল্ট্রাজেনিকা’র তিন কোটি ডোজ ও আন্তর্জাতিক টিকা সরবরাহকারী সংস্থা গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমুনাইজেশন (গ্যাভি) এর মাধ্যমে পাওয়া যাবে ছয় কোটি ৮০ লাখ ডোজ।
প্রতি ব্যক্তির জন্য দুই ডোজ হিসেবে এই নয় কোটি ৮০ লাখ টিকা নিতে পারবেন দেশের চার কোটি ৯০ লাখ মানুষ।
“বিতরণ বিষয়ক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গাইড লাইন অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে যে তিন কোটি ডোজ ভ্যাকসিন সংগ্রহ করা হবে তা মানুষকে বিনামূল্যে প্রদান করা হবে,” মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকের পর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানান খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম।
প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন কক্সবাজার থেকে আবদুর রহমান।