ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এবার গ্রেপ্তার এক কিশোর
2020.06.24
ঢাকা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে ফেসবুকে কটূক্তি করার অভিযোগে নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করে সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে।
গত শনিবার ময়মনসিংহের ভালুকায় উপজেলার হবিরবাড়ির পাড়াগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র মো. ইমনকে (১৫) তার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করার বিষয়টি নিশ্চিত করেন ভালুকা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন।
বুধবার তিনি বেনারকে বলেন, “আটক ইমনের বয়স ১৫ বছর। তাই রোববার আদালতে নেওয়া হলে বিচারক তাকে গাজীপুর কিশোর সংশোধনাগারে (জাতীয় কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র) পাঠানোর আদেশ দেন। বর্তমানে সেখানেই আছে সে।”
মাইনউদ্দিন জানান, গত শুক্রবার ইমন নিজের ফেসবুক আইডি থেকে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে একটি আপত্তিকর পোস্ট দেয়। শনিবার দুপুরে এ ঘটনায় হবিরবাড়ি ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হানিফ মোহাম্মদ নিপুণ তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন।
এক প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, “ওই কিশোরের ফেসবুক পোস্টের কারণে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছিল এবং মামলা হওয়ার কারণে তাকে আমরা গ্রেপ্তার করি।”
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার বেড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক থেকে শুরু করে কিশোররাও এ থেকে রেহাই পাচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আর্টিকেল নাইনটিনের দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক পরিচালক ফারুখ ফয়সাল বেনারকে বলেন, “ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন জনবান্ধব নয়। জনগণের নয়, এই আইন রাষ্ট্র ও সরকারের নিরাপত্তা দেখে।”
তাঁর মতে, “সাইবার ওয়ার্ল্ড থেকে জনগণকে রক্ষা করার ব্যবস্থা এই আইনে থাকা উচিত থাকলেও সেটা নেই।”
তিনি বলেন, শুধু সদ্য প্রয়াত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমকে নিয়ে লেখার কারণে কভিড-১৯ মহামারির মধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এখন পর্যন্ত নয়টি মামলায় বেশ কয়েকজনেক আটক করা হয়েছে।
মানবাধিকার কর্মী নূর খান বেনারকে বলেন, “রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করছেন, তাঁরা এক ধরনের জুজু বুড়ির ভয়ে আছেন। তাঁদের ধারণা, যেকোনো রকমের সমালোচনা বা প্রতিবাদ তাঁদের ক্ষমতার মসনদ কাঁপিয়ে দেবে।”
তিনি বলেন, “এ কারণে একটা লেখার ভিতর কী আছে না আছে, সেটি বিবেচনা না করে সমাজে ভয়ার্ত পরিবেশ তৈরি করতে যেকোনো রকম প্রতিবাদ বা সমালোচনা যাতে না হয় সে চেষ্টা করছেন।”
“এর ফলে বিশ্ববিদ্যিালয় শিক্ষক না শিশু আটক হচ্ছে, এসব তাদের বিবেচনায় আসছে না,” বলেন তিনি।
ভালুকায় আটক কিশোর ইমনের গ্রাম কাদিগর নয়াপড়ার সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মো. সুরুজ মিয়া বেনারকে বলেন, “ইমন অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের সন্তান। সে স্কুলে পড়ার পাশাপাশি রাজমিস্ত্রির কাজ করে সংসারে সাহায্য করে।”
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “শুনেছি সে সম্প্রতি একটি স্মার্ট ফোন কিনেছে। কিন্তু ফেসবুক বা ইন্টারনেট আইন সম্পর্কে কম ধারণার কারণেই কোনো ভুল করে থাকতে পারে।”
বার্তাসংস্থা এফপি বুধবার এক প্রতিবেদনে জানায়, মোবাইল ফোনের ওপর সম্প্রতি ঘোষিত ট্যাক্স প্রসঙ্গে ইমন তার ফেসবুকে ট্যাক্সের বাড়তি টাকা প্রধানমন্ত্রীকে ‘বিধবা ভাতা’ হিসেবে দেওয়া উচিত বলে এক পোস্ট প্রকাশ করার অভিযোগ রয়েছে।
তবে বেনারের পক্ষ থেকে ওই কিশোরের ফেসবুকে এই ধরনের কোনো স্ট্যাটাস খুঁজে পাওয়া যায়নি।
সাংবাদিক কাজলের জামিন নামঞ্জুর
এদিকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় জামিন মেলেনি ফটোসাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলের।
ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে বুধবার ভার্চুয়াল শুনানি শেষে কাজলের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন (ভার্চুয়াল) বিচারক ধীমান চন্দ্র মণ্ডল।
এর আগে মঙ্গলবার মামলাটিতে কাজলকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
শফিকুল ইসলাম কাজলের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বেনারকে বলেন, “শেরেবাংলা নগর থানায় করা মামলায় শফিকুল ইসলাম কাজলের জামিন নামঞ্জুর করেছেন আদালত।”
“তিনি দুটি মামলাতে গ্রেপ্তার আছেন। আরো একটায় এখনো তাঁকে গ্রেপ্তার দেখায়নি। আগামী ২৮ জুন হাজারিবাগ থানায় দায়ের করা আরেকটি মামলার শুনানি রয়েছে। সেদিন আবার তাঁর জামিন চাইব,” বলেন জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।
এতদিন যশোর কারাগারে থাকলেও কাজলকে ঢাকায় আনা হয়েছে বলে জানান তাঁর আইনজীবী।
মানবাধিকার কর্মী নূর খান বলছিলেন, “খেয়াল রাখতে হবে কাজলের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলোর বাদি ক্ষমতার খুব কাছের মানুষ। তাঁদের সমালোচনা করে কাজল কিছু লেখালেখি করায় তাদের আঁতে ঘা লাগে।”
“এই ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা কোনো ধরনের সমালোচনা গ্রাহ্য করতে রাজি না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সাংবাদিক কাজলের ক্ষেত্রে তাঁরা তাঁদের ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছেন। তাঁরা দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে এর পরিসমাপ্তি করে সমাজে ভয়ার্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে চান,” বলেন তিনি।
গত ৯ মার্চ কাজলসহ ৩২ জনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে রাজধানী ঢাকার শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন মাগুরা-১ আসনের সরকার দলীয় সংসদ সদস্য সাইফুজ্জামান শেখর।
এরপর ১০ মার্চ সন্ধ্যায় রাজধানীর হাতিরপুলের ‘পক্ষকাল’ অফিস থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল।
এদিকে ১০ ও ১১ মার্চ রাজধানী হাজারীবাগ ও কামরাঙ্গীরচর থানায়ও কাজলের বিরুদ্ধে আইনে আরও দুটি মামলা করা হয়।
কাজলের স্ত্রী জুলিয়া ফেরদৌসি নয়ন ১১ মার্চ চকবাজার থানায় কাজলের নিখোঁজ বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে ১৮ মার্চ রাতে কাজলকে অপহরণ করা হয়েছে অভিযোগ এনে চকবাজার থানায় মামলা করেন তাঁর ছেলে মনোরম পলক।
নিখোঁজ হওয়ার ৫৩ দিন পর গত ২ মে রাতে যশোরের বেনাপোলের ভারতীয় সীমান্ত সাদিপুর থেকে অনুপ্রবেশের দায়ে শফিকুল ইসলাম কাজলকে আটক করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
পরদিন অনুপ্রবেশের দায়ে বিজিবির করা মামলায় সাংবাদিক কাজলকে জামিন দেয় আদালত। তবে কোতোয়ালি মডেল থানায় ৫৪ ধারায় অপর একটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তখন থেকেই তিনি যশোর কারাগারে ছিলেন।